শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক র আজ ৮০ তম জন্মদিন ।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পৈতৃক নিবাস বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার অন্তর্গত কামারগাতি গ্রামে। তাঁর পিতা আযীমউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। পিতার শিক্ষক হিসেবে অসামান্য সাফল্য ও জনপ্রিয়তা শৈশবেই তাকে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আকৃষ্ট করে।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত সমাজসংস্কারক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি মূলত একজন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। ষাট দশকের একজন প্রতিশ্রুতিময় কবি হিসেবেও পরিচিত তিনি। সমালোচক এবং সাহিত্য সম্পাদক হিসাবেও তিনি রেখেছেন অনবদ্য অবদান।

১৯৭০ দশকে টিভি উপস্থাপক হিসাবে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি আলোকিত মানুষ তৈরির কাজে নিয়োজিত ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের নানা জায়গায়। শিক্ষা জীবনে তিনি ১৯৫৫ সালে পাবনা জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করেন। উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ, বাগেরহাট (বর্তমান সরকারি পি.সি. কলেজ, বাগেরহাট) থেকে ১৯৫৭ সালে।  ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক বি.এ. (অনার্স),  ও ১৯৬১ সালে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৬৫ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

কর্মজীবন

শিক্ষক হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখর স্পর্শ করেছেন। অধ্যাপক হিসেবে তাঁর খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য। তিনি শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন ১৯৬১ সালে, মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি কিছুকাল সিলেট মহিলা কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬২ সালের পহেলা এপ্রিল তিনি রাজশাহী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে সরকারি চাকুরিজীবন শুরু করেন। সেখানে পাঁচ মাস শিক্ষকতা করার পর তিনি ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে যোগ দেন (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ)। এই কলেজে তিনি দু’ বছর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র তেইশ। এরপর তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলেজ ঢাকা কলেজে।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবার সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু ঢাকা কলেজে প্রাণবন্ত, সপ্রতিভ, উজ্জ্বল ছাত্রদের পড়ানোর তৃপ্তি, শিক্ষক-জীবনের অনির্বচনীয়তম আস্বাদ ছেড়ে তিনি যেতে চাননি ৷ তাঁর মতে,

বাংলা বিভাগে যোগদান করাটা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো ছাত্রদের ছেড়ে সবচেয়ে খারাপ ছাত্রদের পড়াতে যাওয়ার মত মনে হয়েছে৷

অধ্যাপক আবু সায়ীদ কখনোই ক্লাসে রোলকল করতেন না। রোলকলকে তার কাছে মনে হতো সময়ের অপব্যয়৷ তাই বছরের পয়লা ক্লাসেই ঘোষণা করে দিতেন রোলকল না করার ৷ তিনি বলেন,

অনিচ্ছুক হৃদয়কে ক্লাশে জোর করে বসিয়ে রেখে কী করব? আমার চ্যালেঞ্জ ছিল এক ধাপ বেশি: কেবল শিক্ষক হওয়া নয়, সব ছাত্রের হৃদয়ের কাছে পৌঁছানো, সব ছাত্রের হৃদয়কে আপ্লুত করা৷

ক্লাশের সেরা ছাত্রটাকে পড়ানোর চেষ্টা করার চেয়ে তিনি পড়াতে চেষ্টা করতেন ক্লাশের সবচেয়ে বোকা ছাত্রটাকে৷ সারাক্ষণ তাকেই বোঝাবার চেষ্টা করতেন, কেননা তার বোঝা মানে ক্লাসের বাকি সবার বোঝা।

টেলিভিশনের বিনোদন এবং শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় তিনি পথিকৃৎ ও অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র:

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ব্যক্তিত্বের সবগুলো দিক সমন্বিত হয়েছে তাঁর “বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের” সংগঠক সত্তায়। তিনি অনুভব করেছেন যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের প্রয়োজন অসংখ্য উচ্চায়ত মানুষ। তাই দেশের আদর্শগত অবক্ষয় দেখে তা থেকে উত্তরণের জন্যে অধ্যাপক সায়ীদ ১৯৭৮ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে তোলেন। “আলোকিত মানুষ চাই”- সারা দেশে এই আন্দোলনের অগ্রযাত্রী হিসেবে প্রায় তিন দশক ধরে তিনি রয়েছেন সংগ্রামশীল। একজন মানুষ যাতে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অধ্যয়ন, মূল্যবোধের চর্চা এবং মানবসভ্যতার যা-কিছু শ্রেয় ও মহান তার ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বসম্পন্ন হয়ে বেড়ে উঠতে পারে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তেমনই এটি সর্বাঙ্গীণ জীবন-পরিবেশ।”

বাংলাদেশে পাঠাগারের অপ্রতুলতা অনুধাবন করে  ১৯৯৮ সালে থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি  কার্যক্রম আরম্ভ করে। নরওয়েজিয় সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এই কার্যক্রমে বই-ভর্তি একটি বাস পাঠকের দুয়ারে গিয়ে হাজির হয়। প্রথমদিকে ঢাকায় কার্যক্রমটি ঢাকায় আরম্ভ হলেও আজ তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের অধিকাংশ জেলায়।

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের কার্যক্রমের পাশাপাশি স্যার জড়িত আছেন পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলনে, ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলনে এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের আশাবাদ নিয়ে জড়িত হয়েছেন ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’ এর একজন ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য হিসাবে।

পুরস্কার

২০০৪: রামোন ম্যাগসেসে পুরস্কার

২০০৫: শিক্ষায় অবদানের জন্য একুশে পদক।[৪]

২০১২: প্রবন্ধে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার।[৫]

২০১৭: বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন থেকে পালমোকন-১৭ সম্মাননা।

২৫ জুলাই আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ৮০তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে চ্যানেল আই।

এই সাহিত্যিকের গল্প থেকে চ্যানেলটি নির্মাণ করেছে টেলিছবি ‘রূবিরন’। আর এটি প্রচার হবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্মদিনে।

চ্যানেল আইয়ের মহাব্যবস্থাপক (অনুষ্ঠান) আমীরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে টেলিফিল্মটি পরিচালনা করেছেন মোঃ মাহফুজুল হক এবং মাইনুল হাসান হীরা।

এতে প্রধান চরিত্র অভিনয় করেছেন চিত্রনায়িকা মৌসুমী।

টেলিফিল্মটি ২৫ জুলাই (বুধবার) দুপুর ৩টা ৫ মিনিটে প্রচার হবে।

২৯টি সম্পাদনা : সাহিত্য পত্রিকা ‘কণ্ঠস্বর’ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : উত্তর প্রজন্ম (২০০৮) ।সংগঠন ও বাঙালি (২০০৩)। স্বর্ণদীপিতা (২০১০)। রৌদ্র ও প্রকৃতির কাব্য (২০০৯) ।রোদরূপসী (২০০৬) স্বপ্নের সমান বড়। (২০১২) স্বনির্বাচিত প্রবন্ধ ও রচনা (২০০০) ।ওড়াউড়ির দিনগুলো (২০০৯) । অন্তরঙ্গ আলাপ (২০১২) ।নদী ও চাষীর গল্প (২০০৬)।  নিষ্ফলা মাটির কৃষক (২০০৬) ।নিউইয়ের্কর আড্ডা (২০০৭) ।মুখোমুখি (২০০৭) দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০০৮) ।বন্ধ দরজায় ধাক্কা (২০০০) বহে জরবতী ধারা (২০০৬) বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি (২০০৭) । বিস্রস্ত জার্নাল (২০০৭) বিদায়, অবন্তী! । (২০০৫) ভালোবাসার সাম্পান (২০০৭) আমার উপস্থাপক জীবন (২০০৮) আমার বোকা শৈশব (২০১০) । আমার আশাবাদ (২০০৯) উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭) । র্যা মন ম্যাগসাসাই পুরস্কার (২০০৪) । একুশে পদক (২০০৫) । পরিবেশ পদক, বাংলাদেশ সরকার (২০০৮)।  বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০১১)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *