ইন্টারনেটের আসক্তিতে শিশুরা

গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে রোম যাবেন আবির আর রুনা দম্পতি। লাগেস গুছাতে গিয়ে মনে হলো রোমের আবহাওয়া সর্ম্পকে একটা খোজ নেওয়া দরকার , হাতের মোবাইলটি নিয়ে গুগলে সার্চ দিতেই চলে এলো রোমের আবহাওয়ার সংবাদ।এমনি ভাবে, ওয়েদার আপডেট, উবার,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদি অ্যাপস গুলো আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়িয়েছে সর্ম্পূণ ভাবে। মোবাইল ডাটা, ওয়াই-ফাইয়ের কল্যানে এক ক্লিকেই আমরা ঢুকে যাচ্ছি আরেক দুনিয়ায়।

ইন্টারনেট অল্পবয়সীদের জন্য অনেক ইতিবাচক শিক্ষাগত,  এবং সামাজিক সুবিধা প্রদান করেলেও দুর্ভাগ্যবশত এর ঝুঁকিও রয়েছে খুব বেশী। অনলাইনে অধিক সময় ব্যয় করায় ইন্টারনেটকে বর্তমানে ‘ডিজিটাল কোকেন’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে।

ছোটবেলা থেকে শিশুকে সহজে সামলানোর জন্য বা শান্ত রাখার জন্য ,শিশুদের খাওয়তে গিয়ে কিংবা ছড়া শিখাতে গিয়ে বাবা-মায়েরা হাতে তুলে দিচ্ছেন ট্যাব, মোবাইলসহ বিভিন্ন গেজেট। চালিয়ে দিচ্ছেন গেমস,ইয়োটিওব চ্যানেল। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, ফোন বা ট্যাব ছাড়া শিশুকে সামলানো যাচ্ছে না। না দিলেই শুরু হয়ে যায় রাগ, জিদ, চিত্কার কিংবা ভাঙচুর। অনেক সময় মা-বাবা নিজেরাই দিনের অনেকটা সময় ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মগ্ন থাকেন যা দেখে শিশুরাও এটি শেখে।

খোলা মাঠে শিশুরা দৌড়াচ্ছে, তাদের হাসি কোলাহলে চারিদিক মুখর হয়ে আছে ,ঢাকার মতো মেগা সিটির জন্য এই দৃশ্যটা একবারে অবাস্তব হয়ে দাড়িয়েছে । নগরায়নের ফলে হারিয়ে গিয়েছে খেলার মাঠ। শিশুদের দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাটাতে হচ্ছে স্কুলে, আবার মাঠের অভাবে টিফিনের ফাঁকেও খেলার সুযোগ পায় না তারা। অন্যদিকে যানজট, নিরাপত্তাহীনতার কারণে মা-বাবা শিশুকে বাসা থেকে একটু দূরের মাঠে খেলতে নিয়ে যাওয়া বা বেড়াতে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন।

স্বভাবতই তার অবসর বিনোদনের একমাত্র স্থান হচ্ছে নানা ধরেণর ইলেকট্রনিক ডিভাইস। শিশুদের অতিরিক্ত অনলাইনে থাকার কারনে শিশুদের বিলম্বিত বিকাশ ঘটতে পারে। এতে বাধাগ্রস্ত হতে পারে শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ। “শিশু / কিশোরবয়দের উপর ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রভাব”, বইটির লেখক মনোবিজ্ঞানী কালেভানি গেসেনি সাভিমি বলেন,দীর্ঘক্ষন ইন্টারনেট ব্যবহারের কারনে শিশুদের মাঝে স্থূলতা দেখা দেয়। একটানা গেজেটের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে অল্প বয়সেই শিশুদের চোখের সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হচ্ছে। এছাড়াও

 মস্তিষ্কের দ্রুত প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।
 EMF radiation নির্গমনের ফলে শিশুর মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
 মারাত্মকভাবে ঘুমের ক্ষতি হতে পারে।
 প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর মাঝে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, attachment disorder, মনোযোগ ঘাটতি, bipolar disorder, মনোব্যাধি এবং সন্তানের আচরণগত বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে ।
 অনেক সিনেমা, গেমস এবং টিভি শোতে চুরি, স্পষ্টভাবে যৌনতা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন বা অঙ্গহানি দেখানো হয় যা শিশুকে সহিংস হতে উদ্ভুদ্ধ করে।
 উচ্চগতিসম্পন্ন গেমস বা মিডিয়া কনটেন্ট-এর কারণে শিশুর মনঃসংযোগে ঘাটতি দেখা যায়। এতে শিশুর পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়; স্কুলের প্রতিও তৈরি হয় অনীহা।
 অনেক সময় শিশু শুধু কার্টুনের চরিত্রের নেতিবাচক দিকগুলোই শেখে।
 শিশুর নৈতিক অবক্ষয় ঘটে

শিশুদের ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখার জন্য বাবা মায়েদের প্রতি কিছু টিপস দেয়া হল , ব্যবহার করে দেখতে পারেন কাজে লাগলেও লাগতে পারে।
 বাসার কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা ফোনে প্রাইভেসি সেটিং অথবা পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখুন। কারণ আপনির অনুপস্থিতিতে সে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করতে পারে। তাই সবসময় এসব প্রযুক্তি নিজের আয়ত্তে রাখার চেষ্টা করুন।
 শারীরিকভাবে বিভিন্ন আউটডোর খেলাধুলার প্রতি শিশুদের আগ্রহী করে তুলতে হবে।
 শিশুর খেলা ও পড়ার রুটিন করে দিন। যাতে তার পড়ার চাপ না পড়ে আর খেলাধুলার পর্যাপ্ত সময় পায়।
 শিশুকে মাঝে মধ্যে বেড়াতে নিয়ে যান। এতে তার মানসিক বিকাশ ঘটবে।
 শিশুর বয়স অনুযায়ী তাকে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বইপড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে।
 ঘরের মধ্যে এমন এক জায়গায় কম্পিউটার রাখুন যেখানে সারাদিন কেউ না কেউ যাতায়াত করে। যাতে শিশুরা একা একা কোন আজেবাজে জিনিস না দেখতে পারে।

সাধারনত একাকিত্ব, বাবা মায়ের মনোযোগের অভাবে শিশুরা ইন্টানেটের উপর অতিমাত্রায় র্নিভরশীল হয়ে পরে। এটিও ঠিক ইন্টারনেটের এই যুগে শিশুদের পুরোপুরি অনলাইন থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়। তাই একসাথে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে চেষ্টা করুন তাহলেও মাত্রাতিরিক্তা ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবনতা কমবে।এছাড়াও পরিবারের সদস্যদের উচিত তাদের শিশুদের উপর অধিক সময় ও মনোযোগ দেয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *