বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১ এর জন্য ১৫ বছরে কত টাকা ব্যয় হবে?

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইটের এলিট ক্লাবের দেশগুলোর অভিজাত ক্লাবে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। ঐতিহাসিক এই মুহূর্তের সাক্ষী হতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে হাজির ছিলেন সহস্রাধিক বাংলাদেশি। তাঁদের কেউ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী, আবার কেউ বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদসহ সরকারের একটি ৩০ সদস্যের প্রতিনিধিদল। কেনেডি স্পেস সেন্টারের দুটি স্থান থেকে দর্শনার্থীদের জন্য স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সরাসরি দেখার ব্যবস্থা ছিল। একটি স্থান অ্যাপোলো বা স্যাটার্ন-৫ সেন্টার, উৎক্ষেপণস্থল থেকে যার দূরত্ব ৬ দশমিক ২৭ কিলোমিটার। এ ছাড়া কেনেডি স্পেস সেন্টারের মূল দর্শনার্থী ভবন (মেইন ভিসিটর কমপ্লেক্স) থেকেও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ দেখার ব্যবস্থা ছিল। উৎক্ষেপণস্থল থেকে এটির দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। দেশের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিয়ে সারা দেশের মানুষের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের দৃশ্য দেখতে গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জেলা প্রশাসক জায়ান্ট স্ক্রিনের ব্যবস্থা করে।
তিন হাজার ৫০০ কেজি ওজনের জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফ্যালকন-৯ কক্ষপথের দিকে ছুটবে কেনেডি স্পেস সেন্টারের ঐতিহাসিক লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯-এ থেকে, যেখান থেকে ১৯৬৯ সালে চন্দ্রাভিযানে রওনা হয়েছিল অ্যাপোলো-১১। স্পেসএক্স এবারই প্রথম উপগ্রহ উৎক্ষেপণে তাদের ফ্যালকন-৯ রকেটের বøক ৫ সংস্করণ ব্যবহার করেছে।

বদলে যাবে দেশের তথ্য-প্রযুক্তি: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে স্যাটেলাইট সদস্য দেশের তালিকায় ৫৭তম দেশ হিসেবে নাম লেখালো বাংলাদেশ। আর এর মাধ্যমে দেশের তথ্য-প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ফলে একদিকে যেমন বাংলাদেশ নিরবিচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদান করতে পারবে, তেমনি সম্প্রচার সেবা, টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-এডুকেশন, ডিটিএইচ সেবা প্রদান করতে পারবে। এছাড়া ট্রান্সপন্ডার লীজের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের পর কিছুদিন পরীক্ষামূলকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তিন মাস পর বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম শুরু হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের। স্যাটেলাইটে থাকা ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২০টি বাংলাদেশে নিজেদের ব্যাবহারের জন্য রাখা হবে। বাকী ২০টি ট্রান্সপন্ডার ভাড়া কিংবা বিক্রি করা হবে বিদেশের কাছে। বিটিআরসির এক কর্মকর্তা জানান, দেশের জন্য রাখা ২০টি ট্রান্সপন্ডার থেকেই দেশের টেলিভিশন চ্যানেল থেকে শুরু করে ডিরেক্ট টু হোম (ডিটিএইচ) পরিচালনাকরী প্রতিষ্ঠানগুলো ভাড়া নিতে পারবেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আবেদনও করেছে। তবে উৎক্ষেপণের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে মন্ত্রণালয়।

‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ স্থাপনের লক্ষ্যে ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটালের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারস্পুটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব স্পেস কমিউনিকেশনসকে ১৫ বছরের জন্য দুই কোটি ৮০ লাখ ডলার দিতে হবে  যা বাংলাদেশী টাকায় ২৩৭ কোটি টাকার্র বেশী । বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিদেশী স্যাটেলাইটের ফ্রিকোয়েন্সি ভাড়া নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেল, টেলিফোন, রেডিওসহ অন্যান্য যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। এতে প্রতি বছর ভাড়া বাবদ বাংলাদেশকে ১৪ মিলিয়ন ডলার গুণতে হয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কার্যক্রম শুরু হলে দেশে শুধু বৈদেশিক মুদ্রারই সাশ্রয়ই হবে না, স্যাটেলাইটের অব্যবহৃত অংশ নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের মতো দেশে ভাড়া দিয়ে প্রতি বছর ৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থ আয় করা যাবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে এ স্যাটেলাইট। স্যাটেলাইট পাঠানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। এজন্য গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি ৪০টি ট্রান্সপন্ডার ক্যাপাসিটি সম্পন্ন হবে। এই ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য ২০টি রাখা হবে। স্যাটেলাইট ডিজাইন লাইফ ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের জনগণের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে এই ২০টি ট্রান্সপন্ডার যথেষ্ট হবে বলে মনে করছে ডাক ও টেলিযোগযোগ মন্ত্রণালয়। আর বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকায় অবশিষ্ট ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিক্রি বা ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে বিশ্বে ৫৬টি দেশের নিজস্ব উপগ্রহ রয়েছে। আর দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ভারত (১৯৭৫), পাকিস্তান (১৯৯০) ও শ্রীলঙ্কার (২০১২) নিজস্ব স্যাটেলাইট রয়েছে। ২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণে ‘স্যাটেলাইট সিস্টেম’ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ১১ নভেম্বর ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণের জন্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ‘স্যাটেলাইট সিস্টেম’ কিনতে থালিসের সঙ্গে চুক্তি করে বিটিআরসি।

One thought on “বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১ এর জন্য ১৫ বছরে কত টাকা ব্যয় হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: