সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আজ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি শুভ জন্মাষ্টমী।

অধর্মকে বিনাশ করে ধর্ম স্থাপনের জন্যই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবির্ভাব।

আজ শুভ জন্মাষ্টমী। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি। সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তরা বিশ্বাস করেন, পৃথিবী থেকে দুরাচারী দুষ্টদের দমন করা আর সাধু লোকদের রক্ষা করার জন্যই মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই দিনই স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

সত্য এবং ত্রেতা যুগের পরে আসে দ্বাপর যুগ। সত্য যুগে সকলে ছিল সত্যবাদী। সত্য ছিল প্রতিটি স্থানে প্রতিটি স্তরে। মোটকথা ধর্ম ছিল ১০০ ভাগ।

সত্য যুগে পরে আসে ত্রেতা যুগ। ত্রেতায় চার অংশের এক অংশ চলে আসে অধর্ম। আর দ্বাপরে বিরাজ করে অর্ধেক ধর্ম এবং অর্ধেক অধর্ম। মানুষের মধ্যে আসে স্বার্থের মনোভাব, অনেক মানুষই হয়ে ওঠে অত্যাচারী এবং দাঙ্গা হাঙ্গামামানুষের মধ্যে লেগেই থাকে।

ধর্ম মাথা ঠুঁকে কাঁদতে থাকে। ঠিক এমন সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের গর্ভে, মানুষ রূপে, মানুষের মাঝে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়। পিতা বসুদেব ছিল স্বয়ং মহত্তম প্রাণিক শক্তি এবং মাতা দেবকী ছিলো দেব শক্তির মূর্ত
প্রতীক।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবতারিত হয়ে তিনটি কাজ করেছিল (১) যারা খারাপ কাজ করে অর্থাৎ অধর্মের পথে চলে তাদের বিনাশ করেছিল (২) যারা ভালো কাজ করে অর্থাৎ ধর্মের পথে চলে তাদের রক্ষা করেছিল এবং (৩)
ধর্মস্থাপন করেছিল।

পৃথিবীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হয়ে অনেক অর্ধামিক, দুস্কৃতকারী ও অত্যাচারীদের বিনাশ করেছিল। যাদের মধ্যে কংস ও জরাসন্ধ উল্লেখযোগ্য। কংস ছিল মথুরার ধার্মিক রাজা উগ্রসেনের পুত্র। কিন্তু পিতা ধার্মিক হলে কি হবে পুত্র ছিল প্রচণ্ড রকমের অধার্মিক ও অত্যাচারী।

তাইতো তিনি বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করতে লাগলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য। অবশ্য কংস নিজেও দৈববাণীতে জেনেছিলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের (কংসের বোন দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান) হাতেই তার মৃত্যু হবে।

কংস অংকুরকে পাঠালো শ্রীকৃষ্ণকে নিমন্ত্রণ করতে এবং অভিসন্ধির কথা জানাতে। শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম (দেবকীর সপ্তম গর্ভের সন্তান অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের বড় ভাই) নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে মথুরায় এসে মল্ল যুদ্ধে যোগ দেয়।

যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামের শক্তির সঙ্গে পরাজিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এ দেখে কংস রেগে এবং ক্ষোভে হিতাহিত উপায় না দেখে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে তখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত যশোদার স্বামী, শ্রীকৃষ্ণের পিতা বসুদেব এবং নিজ পিতা উগ্রসেনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে বলে।

এ কথা শুনে শ্রীকৃষ্ণ কাল বিলম্ব না করে মঞ্চের উপর লাফিয়ে উঠে কংসের চুলের মুঠি ধরে মাটিতে নামিয়ে এনে সেই মুহূর্তে হত্যা করে সকলকে মুক্ত করে দেয়।

এবার জরাসন্ধের পালা। জরাসন্ধ ছিলো কংসের শশুর। যে কারণে জামাতার মৃত্যুটা তার নিকট স্বাভাবিক ছিল না। তাইতো তিনি বিস্তার করতে থাকে অশান্তির কালো ছায়া এবং শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করাটাই ছিল
তার মূখ্য উদ্দেশ্য।

সে জন্যই তিনি বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে মথুরা আক্রমণ করে। শ্রীকৃষ্ণ
ও বলরাম অল্প শক্তি দিয়ে দেব অস্ত্রের সহায়তায় সমস্ত বাহিনীকে পরাস্ত
করে জরাসন্ধকে বন্দী করে।

বলরামের অবশ্য ইচ্ছা ছিল তৎক্ষণাৎ জরাসন্ধকে হত্যা করা। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে ক্ষমা করে ছেড়ে দেয়। এ ঘটনায় জরাসন্ধ লজ্জিত হলো ঠিকই, তবে পরাজয়ের গ্লানিটা তার মধ্যে প্রচন্ড রকমের বেড়ে গেল।

যার ফলশ্র“তিতে জরাসন্ধ পর পর সাত বার সৈন্য নিয়ে মথুরা আক্রমণ করেছিল এবং প্রত্যেক বারই পরাজিত হয়ে ফিরেছিল। এতে শ্রীকৃষ্ণ জরাসন্ধের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে ভীমকে সঙ্গে নিয়ে জরাসন্ধকে হত্যা করেছিল
এ ভাবে অধর্মকে বিনাশ করে ধর্মকে স্থাপন করার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনেক অধার্মিক হত্যা করেছে এবং বিভিন্ন যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে কুরু-পান্ডবদের সঙ্গে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ অন্যতম। কুরুক্ষেত্র প্রান্তরে এই যুদ্ধ হয়েছিল বলে যুদ্ধের নাম হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ।

স্বার্থলোভী, অত্যাচারী ও ক্ষমতা ধৃতরাষ্ট্র ও তার যুদ্ধধনাদী শত পুত্র। পান্ডু ও ধৃতরাষ্ট্র ছিল দুই ভাই। জন্ম থেকেই অন্ধ ছিল ধৃতরাষ্ট্র। যার ফলে ধৃতরাষ্ট্রের পরিবর্তে পান্ডুই রাজা হয়।

পান্ডুর মৃত্যুর পর রাজা হওয়ার কথা পান্ডুর ছেলে পঞ্চ-পাণ্ডবের। কিন্তু এটা ধৃতরাষ্ট্র রাজী না হয়ে সমর্থন করলো নিজ পুত্র দুর্যোধনকে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত মতো সমস্ত রাজ্যটাকে দুই ভাগ করে, এক ভাগ দেওয়া হলো পঞ্চ-পাণ্ডবের এক ভাই যুধিষ্ঠিরকে এবং অন্য ভাগ দেওয়া হলো ধৃতরাষ্ট্রের ছেলে দুর্যোধনকে।

অবশ্য অর্ধেক রাজ্য পেয়ে মোটেই সন্তুষ্ট ছিল না দুর্যোধন। কারণ তার চাওয়া ছিল সমস্ত রাজ্যটাই। কিছুদিন পরে কপট পাশা খেলায়
পান্ডবদের হারিয়ে বার বছরের জন্য বনবাসে ও এক বছরের জন্য অজ্ঞাতবাসে পাঠিয়ে দেয়। পান্ডবরা বরাবরই ছিল ধার্মিক।

আর তাইতো খেলার পূর্ব শর্ত মতো তের বছরের জন্য বনবাসে ও অজ্ঞাতবাসে চলে যায়। তবে শর্ত এটাও ছিল যে তের বছর পর ফিরে এলে তাদেরকে আবার রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

কিন্তু সমস্যাটা এখানেই হয়েছিল যে তের বছর পর পান্ডবরা ফিরে এলে দুর্যোধন তাদেরকে রাজ্য ফিরে দিতে অস্বীকার করায়। তখন নিরূপায় হয়ে পান্ডবরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিকট এলো পরামর্শ নেওয়ার জন্য।

অবশ্য শ্রীকৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্র ও দুর্যোধনের অত্যাচারের কথা পূর্ব থেকেই জানতো। তখন পান্ডবদের পক্ষ হয়ে শ্রীকৃষ্ণ দুর্যোধনের নিকট গেল আলোচনার
মাধ্যমে একটা সমাধান করার জন্য।

কিন্তু কোনই সুফল হলো না এবং যার পরিনাম দাড়ায় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। একটানা ১৮ দিন ভীষণ যুদ্ধ হলো। উভয় পক্ষেরই অনেক সৈন্য প্রাণ হারালো। তবে শেষ পর্যন্ত জয়ী হলো পাণ্ডবেরা এবং শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে অশ্বমেথ যজ্ঞ করে নিজেদের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করলো।

শ্রীকৃষ্ণ তার জীবনে যা কিছু করুক না কেন লক্ষ্য একটাই ছিল আর সেটি হলো ধর্ম স্থাপন করা এবং সিটি সেটা করতে সক্ষম হয়েছে। এক কথায় বলা যায় ধর্মরাজ্য সংস্থাপন শ্রীকৃষ্ণের গৌরবময় ভূমিকা এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত।

তবে শ্রীকৃষ্নের শ্রেষ্ঠ অবদান হচ্ছে তার মুখ নিঃসৃত বাণী। যা বই আকারে পাওয়া যায় এবং যার নাম ‘শ্রীমদ্ভগবদগীতা’। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণীই গীতার বাণী, যে বাণী সুখের, যে বাণী ধর্মের এবং যে বাণী শান্তির।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *