৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব

ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার (যা জিডিপির ১৮.৩ শতাংশ) বিশাল বাজেট প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন।

এবারের বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছর বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন বাজেট দেশের অর্থনীতির সব খাতের সুষম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রা’ শিরোনামে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন। এ সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এই নিয়ে অর্থমন্ত্রী টানা ১০টি বাজেটসহ মোট ১২টি বাজেট উপস্থাপন করে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ স্বাক্ষর করেন।

বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই অর্থমন্ত্রী মহান আল্লাহতায়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করে বলেন, তিনি আমাকে আমার দ্বাদশ বাজেট এই মহান সংসদে পেশ করার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহর রহমত সীমাহীন এবং সেই রহমত আমার ওপরে তিনি দুহাতে বর্ষণ করেছেন। আমি আমার ৮৫ বছর বয়সে বাজেট প্রণয়নের মত একটি কঠিন কাজ এবারেও করতে পেরেছি। এরপর তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ, মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা (জিডিপির ১৮.৩ শতাংশ)। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহের প্রায় ৭ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দ বিবেচনায় নিলে বাজেটের আকার দাঁড়াবে প্রায় ৪ লাখ ৭২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা (জিডিপির ১৮.৬ শতাংশ)। অনুন্নয়নসহ অন্যান্য খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা (জিডিপির ১১.৫ শতাংশ) এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা।

তিনি বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩.৪ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড উৎস থেকে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা (জিডিপির ১১.৭ শতাংশ) সংগ্রহ করা হবে। আমি বিশ্বাস করি, রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত। কারণ, ইতিমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জনবল ও কর্মপদ্ধতিতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক অবস্থানে রয়েছে। কর পরিপালনের প্রবণতা দেশে বর্তমানে বেশ উচ্চমানের এবং এ প্রবণতা অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এনবিআর বহির্ভূত সূত্র হতে কর রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৪ শতাংশ)। এছাড়া কর-বহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আহরিত হবে ৩৩ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৩ শতাংশ)।

মুহিত বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মানবসম্পদ (শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য) খাতে ২৬.৯ শতাংশ, সার্বিক কৃষি খাতে (কৃষি, পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান, পানিসম্পদ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য) ২১.৮ শতাংশ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ১৪.৩ শতাংশ, যোগাযোগ (সড়ক, রেল, সেতু এবং যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য) খাতে ২৬.৩ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ১০.৮ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।

বাজেট ঘাটতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সার্বিকভাবে, বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪.৯ শতাংশ। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র থেকে ৫৪ হাজার ৬৭ কোটি টাকা (জিডিপির ২.১ শতাংশ) এবং অভ্যন্তরীণ সূত্র হতে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা (জিডিপির ২.৮ শতাংশ) সংগ্রহ করা হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা হতে সংগৃহীত হবে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৭ শতাংশ) এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে আসবে ২৯ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা (জিডিপির ১.২ শতাংশ)। বৈদেশিক সহায়তার যে বিশাল পাইপলাইন গড়ে তোলা হয়েছে তার ব্যবহার বাড়াতে পারলে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা যথেষ্ট কমানো সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস এবং সে প্রচেষ্টা আমরা চালিয়ে যাবো, যাতে ক্রমাগত বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহারের হার বৃদ্ধি পেতে পারে।

সামগ্রিক ব্যয় কাঠামো প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সম্পাদিত কাজের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী কাজগুলোকে আমরা তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছি। এগুলো হলো সামাজিক অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো ও সাধারণ সেবা খাত।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে মোট বরাদ্দের ২৭.৩৪ শতাংশ, যার মধ্যে মানবসম্পদ খাতে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাত) বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ২৪.৩৭ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে মোট বরাদ্দের ৩০.৯৯ শতাংশ, যার মধ্যে সার্বিক কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ১২.৬৮ শতাংশ; বৃহত্তর যোগাযোগ খাতে ১১.৪৩ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৫.৩৬ শতাংশ। সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে মোট বরাদ্দের ২৫.৩০ শতাংশ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি), বিভিন্ন শিল্পে আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি, রাষ্ট্রায়ত্ত, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য ব্যয় বাবদ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৪.৭৮ শতাংশ; সুদ পরিশোধ বাবদ প্রস্তাব করা হয়েছে ১১.০৫ শতাংশ; নিট ঋণদান ও অন্যান্য ব্যয় খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে অবশিষ্ট ০.৫৪ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বেশ কয়েকটি নীতিকৌশল তুলে ধরেন যার ভিত্তিতে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, এ পর্যায়ে আমি আগামী অর্থবছরসহ সামনের দিনগুলোতে বিভিন্ন খাতে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ নীতি-কৌশল, কর্মপরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ আপনার মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই। এবারের নীতি-কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে গিয়ে আমাদের বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে বেশকিছু প্রেক্ষাপট-প্রথমত: সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন, দ্বিতীয়ত: স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের প্রেক্ষাপটে করণীয় নির্ধারণ, তৃতীয়ত: টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, উৎপাদনশীল শোভন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা-জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপদ জনবসতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের যথাযথ প্রতিফলন; চতুর্থত: অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর; পঞ্চমত: ‘রূপকল্প-২০২১’ এর ধারাবাহিকতায় ‘রূপকল্প-২০৪১’ এর প্রস্তুতি। সর্বোপরি, ক্রমপরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় জনমানুষের চাহিদা ও প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *